২.২.২ সাইটোপ্লাজমীয় অঙ্গাণু (cytoplasmic organelles)
প্রােটোপ্লাজম থেকে নিউক্লিয়াস বা কেন্দ্রিকাটিকে সরিয়ে দিলে যে জেলির মতো বস্তুটি থেকে যায় সেটিই সাইটোপ্লাজম। এই সাইটোপ্লাজমের মধ্যে অনেক ধরনের অণু থাকে। এদের প্রত্যেকের কাজ আলাদা হলেও একে অপরের উপর নির্ভরশীল। এই অশানুপুলোর কোনাে কোনােটি ঝিল্লিযুক্ত আবার কোনাে। কোনােটি ঝিল্লিবিহীন। অনুগুলো হচ্ছে:
ঝিল্লিযুক্ত সাইটোপ্লাজমীয় অঙ্গাণু
(a) মাইটোকন্ড্রিয়া (Mitochondra)
শ্বসনে অংশগ্রহণকারী এ অঙ্গাণু্টি 1886 সালে আবিষ্কার করেন রিচার্ড অন্টম্যান এবং এর নাম দেন'ৰায়ােব্রাস্ট,তৰে বর্তমানে প্রচলিত নামটি দেন বিজ্ঞানী বেনডা। এটি দুই স্তরবিশিষ্ট আবরণী। বা ঝিল্লি দিয়ে ঘেরা। ভিতরের স্তরটি ভিতরের দিকে আঙ্গুলের মতাে ভাঁজ হয়ে থাকে। এদের ক্রিস্টি (cristae) বলে।
ক্রিস্টির গায়ে বৃন্ত গােলাকার বস্তু থাকে, এদের অক্সিজোম (oxisomes) বলে। অক্সিজোমে। উৎসেচকগুলাে (enzymes) সাজানাে থাকে। মাইটোকন্ড্রিয়নের (এক ৰচন) ভিতরে থাকে ম্যাট্রিক্স (matrix)। জীবের শ্বসনকার্যে সাহায্য করা মাইটোকন্ড্রিয়ার প্রধান কাজ। তােমরা পরে দেখবে যে শ্বসন ক্লিয়ার ধাপ চারটি; গ্লাইকোলাইসিস, অ্যাসিটাইল কো-এ সৃষ্টি, ক্রস ক এবং ইলেকট্রন প্রবাহ তন্ম। এর প্রথম ধাপ (প্লাইকোলাইসিসের বিক্রিয়াগুলাে) মাইটোকন্ড্রিয়ায় ঘটে না। তবে দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ ধাপ। মাইটোকন্ড্রিয়ার মধ্যেই সম্পন্ন হয়।
শাসনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ধাপ কেক চক্র (তৃতীয় ধাপে) অংশগ্রহণকারী সৰ উৎসেচক এতে উপস্থিত থাকায় এ বিক্রিয়াগুলাে মাইটোকন্ড্রিয়াতেই সম্পন্ন হয়। তোমরা দেখবে, ক্রেবস চক্রে সবচেয়ে বেশি শক্তি উৎপাদিত হয়। এজন্য মাইটোকক্রিয়াকে কোষের শক্তি উৎপাদন কেন্দ্র বা পাওয়ার হাউস' বলা হয়। জীব তার বিভিন্ন কাজে এই শঞ্জি খরচ করে। কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া সকল উদ্ভিদকোষ ও প্রাণিকোষে মাইটোকক্রিয়া পাওয়া যায়।
এককেন্দ্রিক কোষে মাইটোকন্ড্রিয়া থাকে না। এমনকি কিছু সুকেন্দ্রিক কোষেও (যেমনঃ Trichomonas, Monocercomonoides ইত্যাদি প্রােটোজোয়াতে) মাইটোকন্ড্রিয়া অনুপস্থিত। তাহলে এমন কি হতে পারে যে বিবর্তনীয় ইতিহাসের কোনাে এক সময়ে সুকেন্দ্রিক কোষের ভিতর মাইটোকন্ড্রিয়া কিংবা তার পূর্বসূরী) ঢুকে পড়েছিল এবং তারপর থেকে সেটি কোষের স্থায়ী বাসিন্দা হয়ে গেছে। এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্য-উপাত্ত থেকে এই ব্যখ্যাটিই অনুমান করা হয়।
(b) প্লাস্টিড (Plastid)
বিজ্ঞানী আর্নস্ট হেকেল 1866 সালে উদ্ভিদ কোষের একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ প্লাস্টিড আবিষ্কার করেন। প্লাস্টিডের প্রধান কাজ বা প্রস্তুত করা, খাদ্য সঞ্চয় করা এবং উজিদদেহকে বর্ণময় এবং আকর্ষণীয় করে পরাগায়নে সাহায্য করা। প্লাস্টিড তিন ধরনের—ক্লোরােপ্লাস্ট, ক্রোমােপ্লাস্ট এবং লিউকোপ্লাস্ট।
(i)ক্লোরােপ্লাস্ট (Chloroplast):
সবুজ রঙ্গের প্লাস্টিকে ক্লোরােপ্লাস্ট বলে। পাতা, কচি কাণ্ড ও অন্যান্য সবুজ অংশে এদের পাওয়া যায়। প্লাস্টিডের থানা (grana) অংশ সূর্যালােককে আবদ্ধ করে। রাসায়নিক শক্তিতে রূপান্তরিত করে। এই আবদ্ধ সৌরশক্তি স্ট্রোমাতে (stroma) অবস্থিত উৎসেচক সমষ্টি, বায়ু থেকে গৃহীত কার্বন ডাই-অক্সাইড এবং কোষের ভিতরকার পানি ব্যবহার করে সরল শর্করা তৈরি করে। এই প্লাস্টিজে ক্লোরােফিল থাকে, তাই এদের সবুজ দেখায়। এছাড়া এতে ক্যারােটিনয়েড নামে এক ধরনের রঙ্গকও থাকে।
(ii) ক্রোমোপ্লাস্ট (Chromoplast):
এগুলাে রঙিন প্লাস্টিড তবে সবুজ নয়। এসব প্লাস্টিডে জ্যান্থফিল (হলুদ), ক্যারােটিন (কমল), ফাইকোএরিগ্রিন (লাল), ফাইকোসায়ানিন (নীল) ইত্যাদি রক্ষক থাকে, তাই কোনােটিকে হলুদ, কোনােটিকে নীল আবার কোনােটিকে লাল দেখায়। এদের মিশ্রণজনিত কারণে ফুল, পাতা এবং উদ্ভিদের অন্যান্য অংশ আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। রঙিন ফুল, পাতা এবং পাজরের মূলে এদের পাওয়া যায়। ফুলকে আকর্ষণীয় করে পরাগায়নে সাহায্য করা এদের প্রধান কাজ। এরা বিভিন্ন ধরনের রঞ্জক পদার্থ সংশ্লেষণ করে জমা করে রাখে।
(iii) লিউকোপ্লাস্ট (Leucoplast):
যেসব প্লাস্টিডে কোনাে রঞ্জক পদার্থ থাকে না, তাদের লিউকোপ্লাস্ট বলে। যেসব কোষে সূর্যের আলাে পৌঁছায় না, যেমন মূল, ভুণ, জননকোষ ইত্যাদি সেখানে এদের পাওয়া যায়। এদের প্রধান কাজ খাদ্য সঞ্চয় করা। আলাের সংস্পর্শে এলে লিউকোপ্লাস্ট ক্লোরোপ্লাস্টে রূপান্তরিত হতে পারে।
(c) গলজি বস্তু (Golgi body)
পলজি বস্তু কিংবা পলি কন্তু প্রধানত প্রাণিকোষে পাওয়া যায়, তবে অনেক উদ্ভিদকোষেও এদের দেখা যায়। এটি সিস্টানি। ও কয়েক ধরনের ভেসিকল নিয়ে তৈরি। এর পর্দায় বিভিন্ন উৎসেচকের পানি বিয়োজন সম্পন্ন হয়। জীবকোষে বিভিন্ন পদার্থ নিঃসৃতকরণের সাথে এর নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। হরমােন নিঃসরণেও এর ভূমিকা লক্ষ করা যায়। কোনাে কোনাে বিপাকীয় কাজের সাথেও এরা সম্পর্কিত এবং কখনাে কখনাে এরা প্রােটিল সঞ্চয় করে রাখে।
(d) এন্ডােপ্লাজমিক রেটিকুলাম (Endoplasmic reticulum)
এন্ডােপ্লাজমিক রেটিকুলাম এর আবরণীর গায়ে প্রায়ই রাইবােজোম লেগে থাকে, তাই স্বাভাকিকভাবেই এসব স্থানে প্রােটিন সংশ্লেষণের ঘটনা ঘটে। কোষে উৎপাদিত পদার্থগুলাের প্রবাহ পথ হিসেবে এন্ডােপ্লাজমিক রেটিকুলাম ব্যবহৃত হয়। এগুলাে কখনাে কখনাে প্লাজমা মেমব্রেনের সাথে যুক্ত থাকে, তাই ধারণা করাহয় যে, এক কোষ থেকে অন্য কোষে উৎসেচক ও কোষে উৎপাদিত অন্যান্য বাদি এর মাধ্যমে চলাচল করে। মাইটোকন্ড্রিয়া, কোষগহ্বৰ এগুলাে সৃষ্টিতে এন্ডোপ্লাজমিক রেটিকুলামের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। উজিদ এবং প্রাণী উভয় কোষেই এরা উপস্থিত থাকে।
(e) কোষগহবর (Vacuole)
সাইটোপ্লাজমে কোষের মধ্যে যে আপাত ফাঁকা স্থান দেখা যায়, সেগুলােই হচ্ছে কোষগহ্বর। বৃহৎ কোষগহ্বর উদ্ভিদ কোষের বৈশিষ্ট্য। এর প্রধান কাজ কোষরস ধারণ করা। বিভিন্ন ধরনের অজৈব লবণ, আমিষ, শর্করা, চর্বিজাতীয় পদার্থ, জৈব এসিড, রঞ্জক পদার্থ, পানি ইত্যাদি এই কোষরসে থাকে। প্রাণিকোষে কোষগর সাধারণত অনুপস্থিত থাকে, তবে যদি কখনাে থাকে, তবে সেগুলো আকারে ছােট হয়।
(f) লাইসােজোম (Lysosome)
লাইসোজোম জীবকোষকে জীবাণুর হাত থেকে রক্ষা করে। এর উৎসেচক আগত জীবাণুগুলােকে হজম করে ফেলে। এর পরিপাক করার উৎসেচকগুলাে একটি পর্দা দিয়ে আলাদা করা থাকে, তাই অন্যান্য অশন্থি এর সংস্পর্শে এলেও হজম হয় না। দেহে অক্সিজেনের অভাব হলে বা বিভিন্ন কারণে লাইসােজোমের পর্দা ক্ষতিগ্রস্ত হলে তখন এর আশেপাশের অলপুলো নষ্ট হয়ে যায়। কখলে কোষটিই মারা যায়।
.png)
.png)
.png)
.png)