রক্ত (Blood) সম্পর্কে যা আপনার জানা প্রয়োজন। এসএসসি জীববিজ্ঞান ২০২২

 রক্ত (Blood)

রক্ত (Blood)

রক্ত একটি অস্বচ্ছ, মৃদু ক্ষারীয় এবং লবণাক্ত তরল পদার্থ। রক্ত হৃৎপিণ্ড, শিরা, উপশিরা, ধমনি, শাখা ধমনি এবং কৈশিকনালি পথে আবর্তিত হয়। লােহিত রক্তকণিকায় হিমােগ্লোবিন নামক রঞ্জক পদার্থ থাকার কারণে রক্তের রং লাল দেখায়। হাড়ের লাল অস্থিমজ্জাতে রক্তকণিকার জন্ম হয়।


রক্তের উপাদান


রক্ত এক ধরনের তরল যােজক কলা। রক্তরস এবং কয়েক ধরনের রক্তকণিকার সমন্বয়ে রক্ত গঠিত।


(a) রক্তরস (Plasma)


রক্তের বর্ণহীন তরল অংশকে রক্তরস বলে। সাধারণত রক্তের শতকরা প্রায় 55 ভাগ রক্তরস। রক্তরসের প্রধান উপাদান পানি। এছাড়া বাকি অংশে কিছু প্রােটিন, জৈবযৌগ ও সামান্য অজৈব লবণ দ্রবীভূত অবস্থায় থাকে। এর মধ্যে যে পদার্থগুলাে থাকে তা হলাে:


  1. প্রােটিন, যথা অ্যালবুমিন, গ্লোবিউলিন ও ফাইব্রিনােজেন
  2. গ্লুকোজ
  3. ক্ষুদ্র ক্ষুদ্ৰ চৰ্বিকণা
  4. খনিজ লবণ
  5. ভিটামিন
  6. হরমােন
  7. এন্টিবডি
  8. বর্জ্য পদার্থ যেমন: কার্বন ডাই-অক্সাইড, ইউরিয়া, ইউরিক এসিড ইত্যাদি।


এছাড়া সামান্য পরিমাণে সােডিয়াম ক্লোরাইড, সােডিয়াম বাইকার্বোনেট ও অ্যামাইনাে এসিড থাকে। আমরা খাদ্য হিসেবে যা গ্রহণ করি তা পরিপাক হয়ে অন্ত্রের গাত্রে শােষিত হয় এবং রক্তরসে মিশে দেহের সর্বত্র সঞ্চালিত হয়। এভাবে দেহকোষগুলো পুষ্টিকর দ্রব্যাদি গ্রহণ করে দেহের পুষ্টির সাধন এবং ক্ষয়পূরণ করে।


চিত্রঃ বিভিন্ন ধরনের রক্তকণিকা (Blood corpuscles )
(b) রক্তকণিকা (Blood corpuscles)


মানবদেহে তিন ধরনের রক্তকণিকা দেখা যায়, লোহিত রক্তকণিকা (Red Blood Corpuscles), শ্বেত রক্তকণিকা (White Blood Corpuscles) এবং অণুচক্রিকা (Blood Platelets)। যদিও এগুলো সব কোষ, তবে রক্তের প্লাজমার মধ্যে ভাসমান কণার সাথে তুলনা করে এদেরকে অনেক দিন আগে রক্তকণিকা নাম দেওয়া হয়েছিল, তখন অণুবীক্ষণ যন্ত্র এখনকার মতো উন্নত ছিল না। সেই নাম এখনও প্রচলিত।


(i) লোহিত রক্তকণিকা


মানবদেহে তিন ধরনের রক্তকণিকার মধ্যে লোহিত রক্তকণিকার সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। এটি শ্বাসকার্যে অক্সিজেন পরিবহনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। লাল অস্থিমজ্জায় লোহিত রক্তকণিকা তৈরি হয়। এর গড় আয়ু 120 দিন।

লোহিত রক্তকণিকা

মানুষের লোহিত রক্তকণিকায় নিউক্লিয়াস থাকে না এবং দেখতে অনেকটা দ্বি-অবতল বৃত্তের মতো। পূর্ণবয়স্ক ব্যক্তির রক্তে লোহিত রক্তকণিকার সংখ্যা প্রতি কিউবিক মিলিমিটারে প্রায় 50 লক্ষ । এটি শ্বেত রক্তকণিকার চেয়ে প্রায় 500 গুণ বেশি।


পুরুষের তুলনায় নারীদের রক্তে লােহিত রক্তকণিকা কম থাকে। তুলনামূলকভাবে শিশুদের দেহে লােহিত রক্তকণিকার পরিমাণ বেশি থাকে। আমাদের জীবনের প্রতি মুহূর্তে লােহিত রক্তকণিকা ধ্বংস হয়, আবার সমপরিমাণে তৈরিও হয়। লােহিত রক্তকণিকার হিমােগ্লোবিন অক্সিহিমােগ্লোবিন হিসেবে অক্সিজেন এবং কার্বন ডাই-অক্সাইড পরিবহন করে।


হিমোগ্লাবিন


হিমােগ্লোবিন এক ধরনের রঞ্জক পদার্থ। লােহিত রক্তকণিকায় এর উপস্থিতির কারণে রক্ত লাল দেখায়। রক্তে প্রয়ােজনীয় পরিমাণ হিমােগ্লোবিন না থাকলে রক্তস্বল্পতা বা রক্তশূন্যতা (anemia) দেখা দেয়। বাংলাদেশের প্রায় দুই তৃতীয়াংশ জনগােষ্ঠী এ রােগে আক্রান্ত।


(ii) শ্বেত রক্তকণিকা বা লিউকোসাইট


শ্বেতকণিকার নির্দিষ্ট কোনাে আকার নেই। এগুলাে হিমােগ্লোবিনবিহীন এবং নিউক্লিয়াসযুক্ত বড় আকারের কোষ। শ্বেত কণিকার গড় আয়ু ১-১৫ দিন। হিমােগ্লোবিন না থাকার কারণে এদের শ্বেত রক্তকণিকা, ইংরেজিতে White Blood Cell বা WBC বলে

শ্বেত রক্তকণিকা বা লিউকোসাইট
শ্বেত কণিকার সংখ্যা RBC-এর তুলনায় অনেক কম। এরা অ্যামিবার মতাে দেহের আকারের পরিবর্তন করে। ফ্যাগােসাইটোসিস প্রক্রিয়ায় এটি জীবাণুকে ধ্বংস করে। শ্বেত কণিকাগুলাে রক্তরসের মধ্য দিয়ে নিজেরাই চলতে পারে। রক্ত জালিকার প্রাচীর ভেদ করে টিস্যুর মধ্যে প্রবেশ করতে পারে।


দেহ বাইরের জীবাণু দ্বারা আক্রান্ত হলে, দ্রুত শ্বেত কণিকার সংখ্যার বৃদ্ধি ঘটে। মানবদেহে প্রতি ঘনমিলিমিটার রক্তে 4-10 হাজার শ্বেত রক্তকণিকা থাকে। অসুস্থ মানবদেহে এর সংখ্যা বেড়ে যায়। স্তন্যপায়ীদের রক্তকোষগুলাের মধ্যে শুধু শ্বেত রক্ত কণিকায় DNA থাকে।


প্রকারভেদ


গঠনগতভাবে এবং সাইটোপ্লাজমে দানার উপস্থিতি বা অনুপস্থিতি অনুসারে শ্বেত কণিকাকে প্রধানত দুইভাগে ভাগ করা যায়, যথা-

  • (ক) অ্যাগ্রানুলােসাইট বা দানাবিহীন
  • (খ) গ্রানুলােসাইট বা দানাযুক্ত


(ক) অ্যাগ্রানুলােসাইট


এ ধরনের শ্বেত কণিকার সাইটোপ্লাজম দানাহীন ও স্বচ্ছ। অ্যাগ্রানুলােসাইট শ্বেত কণিকা দুই রকমের; যথা-লিম্ফোসাইট ও মনােসাইট। দেহের লিম্ফনােড, টনসিল, প্লিহা ইত্যাদি অংশে এরা তৈরি হয়। লিম্ফোসাইটগুলাে বড় নিউক্লিয়াসযুক্ত ছােট কণিকা।

অ্যাগ্রানুলােসাইট
মনােসাইট ছােট, ডিম্বাকার ও বৃক্কাকার নিউক্লিয়াসবিশিষ্ট বড় কণিকা। লিম্ফোসাইট অ্যান্টিবডি গঠন করে এবং এই অ্যান্টিবডির দ্বারা দেহে প্রবেশ করা রােগজীবাণু ধ্বংস করে। এভাবে দেহে রােগ প্রতিরােধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। মনােসাইট ফ্যাগােসাইটোসিস প্রক্রিয়ায় রােগজীবাণুকে ধ্বংস করে।


(খ) গ্রানুলোসাইট


এদের সাইটোপ্লাজম সূক্ষ্ম দানাযুক্ত। গ্রানুলােসাইট শ্বেত কণিকাগুলাে নিউক্লিয়াসের আকৃতির ভিত্তিতে তিন প্রকার যথা: নিউট্রোফিল, ইওসিনােফিল এবং বেসােফিল। নিউট্রোফিল ফ্যাগােসাইটোসিস প্রক্রিয়ায় জীবাণু ভক্ষণ করে। ইওসিনােফিল ও বেসােফিল হিস্টামিন নামক রাসায়নিক পদার্থ নিঃসৃত করে দেহে এলার্জি প্রতিরােধ করে। বেসসাফিল হেপারিন নিঃসৃত করে রক্তকে রক্তবাহিকার ভিতরে জমাট বাঁধতে বাধা দেয়।


(iii) অণুচক্রিকা বা থ্রম্বােসাইট


ইংরেজিতে এদেরকে প্লেইটলেট (Platelet) বলে। এগুলাে গােলাকার, ডিম্বাকার অথবা রড আকারের হতে পারে। এদের সাইটোপ্লাজম দানাদার এবং সাইটোপ্লাজমে কোষ অঙ্গাণু- মাইটোকন্ড্রিয়া, গলি বস্তু থাকে; কিন্তু নিউক্লিয়াস থাকে না।


অনেকের মতে, অণুচক্রিকাগুলাে সম্পূর্ণ কোষ নয়; এগুলাে অস্থি মজ্জার বৃহদাকার কোষের ছিন্ন অংশ। অণুচক্রিকাগুলাের গড় আয়ু ৫-১০ দিন। পরিণত মানবদেহে প্রতি ঘনমিলিমিটার রক্তে অণুচক্রিকার সংখ্যা প্রায় আড়াই লাখ। অসুস্থ দেহে এদের সংখ্যা আরও বেশি হয়।

অণুচক্রিকা বা থ্রম্বােসাইট
অণুচক্রিকার প্রধান কাজ হলাে রক্ত তঞ্চন করা বা জমাট বাঁধানােতে (blood clotting) সাহায্য করা। যখন কোনাে রক্তবাহিকা বা কোনাে টিস্যু আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে কেটে যায়, তখন সেখানকার অণুচক্রিকাগুলাে সক্রিয় হয়ে উঠে অনিয়মিত আকার ধারণ করে এবং থ্রম্বােপ্লাসটিন (Thromboplastin) নামক পদার্থ তৈরি করে।


এ পদার্থগুলাে রক্তের প্রােটিন প্রােথ্রমবিনকে থ্রমবিনে পরিণত করে। থ্রমবিন পরবর্তী সময়ে রক্তরসের প্রােটিন- ফাইব্রিনােজেনকে ফাইব্রিন জালকে পরিণত করে রক্তকে জমাট বাধায় কিংবা রক্তের তঞ্চন ঘটায়। ফাইব্রিন একধরনের অদ্রবণীয় প্রােটিন, যা দ্রুত সুতার মতাে জালিকা প্রস্তুত করে। এটি ক্ষত স্থানে জমাট বাঁধে এবং রক্তক্ষরণ বন্ধ করে। তবে রক্ত তঞ্চন প্রক্রিয়াটি আরও জটিল, এ প্রক্রিয়ায় জন্য আরও বিভিন্ন ধরনের রাসায়নিক পদার্থ এবং ভিটামিন K ও ক্যালসিয়াম আয়ন জড়িত থাকে।


রকে উপযুক্ত পরিমাণ অণুচক্রিকা না থাকলে রক্তপাত সহজে বন্ধ হয় না। ফলে অনেক সময় রােগীর প্রাণনাশের আশঙ্কা থাকে।


রক্তের কাজ


রক্ত দেহের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। এটি দেহের নানাবিধ কাজ করে, যেমন:


(a) অক্সিজেন পরিবহন: লােহিত রক্তকণিকা অক্সিহিমােগ্লোবিনরূপে কোষে অক্সিজেন পরিবহন করে।


(b) কার্বন ডাই-অক্সাইড অপসারণ: রাসায়নিক বিক্রিয়ার ফলে কোষগুলােতে যে কার্বন ডাইঅক্সাইড উৎপন্ন হয়, রক্তরস সােডিয়াম বাই কার্বনেটরূপে তা সংগ্রহ করে নিয়ে আসে এবং নিঃশ্বাস বায়ুর সাথে ফুসফুসের সাহায্যে দেহের বাইরে বের করে দেয়।


(c) খাদ্যসার পরিবহন: রক্তরস গ্লুকোজ, অ্যামাইনাে এসিড, চর্বিকণা ইত্যাদি কোষে সরবরাহ করে।


(d) তাপের সমতা রক্ষা: দেহের মধ্যে অনবরত দহনক্রিয়া সম্পাদিত হচ্ছে। এতে করে বিভিন্ন অঙ্গে বিভিন্ন মাত্রার তাপ সৃষ্টি হয় এবং তা রক্তের মাধ্যমে দেহের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। এভাবে দেহের সর্বত্র তাপের সমতা রক্ষা হয়।


(e) বর্জ্য পদার্থ নিষ্কাশন: রক্ত দেহের জন্য ক্ষতিকর বর্জ্য পদার্থ বহন করে এবং বিভিন্ন অঙ্গের মাধ্যমে সেসব ইউরিয়া, ইউরিক এসিড ও কার্বন ডাই-অক্সাইড হিসেবে নিষ্কাশন করে।


(f) হরমােন পরিবহন: হরমােন নালিবিহীন গ্রন্থিতে তৈরি এক ধরনের জৈব রাসায়নিক পদার্থ বা রস। এই রস সরাসরি রক্তে মিশে প্রয়ােজন অনুযায়ী বিভিন্ন অঙ্গে সঞ্চালিত হয় এবং বিভিন্ন জৈবিক কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।


(g) রােগ প্রতিরােধ: কয়েক প্রকারের শ্বেত রক্তকণিকা ফ্যাগােসাইটোসিস প্রক্রিয়ায় দেহকে জীবাণুর আক্রমণ থেকে রক্ষা করে। অ্যান্টিবডি ও অ্যান্টিজেন উৎপাদনের মাধ্যমে রক্ত দেহের রােগ প্রতিরােধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে।


(h) রক্ত জমাট বাঁধা: দেহের কোনাে অংশ কেটে গেলে অণুচক্রিকা রক্ত জমাট বাঁধতে সাহায্য করে এবং দেহের রক্তক্ষরণ বন্ধ করে।



ব্লাড গ্রুপ বা রক্তের গ্রুপ এবং সামাজিক দায়বদ্ধতা সম্পর্কে জানতে এইখানে ক্লিক করন

Related Posts

নবীনতর পূর্বতন

যোগাযোগ ফর্ম