ব্লাড গ্রুপ বা রক্তের গ্রুপ এবং সামাজিক দায়বদ্ধতা ২০২৩

ব্লাড গ্রুপ বা রক্তের গ্রুপ


অসংখ্য পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং গবেষণার মাধ্যমে দেখা গেছে যে বিভিন্ন ব্যক্তির লােহিত রক্ত কণিকায় A এবং B নামক দুই ধরনের অ্যান্টিজেন (antigens) থাকে এবং রক্তরসে a ও b দুই ধরনের অ্যান্টিবডি (antibody) থাকে।


এই অ্যান্টিজেন এবং অ্যান্টিবডির উপস্থিতির উপর ভিত্তি করে মানুষের রক্তকে বিভিন্ন গ্রুপে ভাগ করা যায়। একে ব্লাড গ্রুপ বলে।


বিজ্ঞানী কার্ল ল্যান্ডস্টেইনার 1901 সালে মানুষের রক্তের শ্রেণিবিন্যাস করে তা A, B, AB এবং ০— এ চারটি গ্রুপের নামকরণ করেন। সাধারণত একজন মানুষের রক্তের গ্রুপ আজীবন একই রকম থাকে।


নিচের সারণিতে রক্তের গ্রুপের অ্যান্টিবডি এবং অ্যান্টিজেনের উপস্থিতি দেখানাে হলাে:


রক্তের গ্রুপ

অ্যান্টিজেন (লোহিত রক্তকণিকায়)

অ্যান্টিবডি (রক্তরসে)

A

A

b

B

B

a

AB

A,B

নেই

O

নেই

a,b



আমরা উপরের সারণিতে রক্তে বিভিন্ন অ্যান্টিজেন এবং অ্যান্টিবডির উপস্থিতি দেখেছি। এর ভিত্তিতে আমরা ব্লাড গ্রুপকে এভাবে বর্ণনা করতে পারি। যেমন:


গ্রুপ A: এ শ্রেণির রক্তে A এন্টিজেন ও b এন্টিবডি থাকে।

গ্রুপ B: এ শ্রেণির রক্তে B এন্টিজেন ও a এন্টিবডি থাকে।

গ্রুপ AB: এই শ্রেণির রক্তে A ও B এন্টিজেন থাকে এবং কোনো এন্টিবডি থাকে না।

গ্রুপ O: এ শ্রেণির রক্তে কোনো এন্টিজেন থাকে না কিন্তু a ও b এন্টিবডি থাকে।


দাতার লোহিত কণিকা বা কোষের কোষঝিল্লিতে উপস্থিত অ্যান্টিজেন যদি গ্রহীতার রক্তরসে উপস্থিত এমন অ্যান্টিবডির সংস্পর্শে আসে, যা উক্ত অ্যান্টিজেনের সাথে বিক্রিয়া করতে সক্ষম তাহলে, অ্যান্টিজেন -- অ্যান্টিবডি বিক্রিয়া হয়ে গ্রহীতা বা রোগীর জীবন বিপন্ন হতে পারে। এজন্য সব গ্রুপের রক্ত সবাইকে দেওয়া যায় না।


যেমন: তোমার রক্তের গ্রুপ যদি হয় A (অর্থাৎ লোহিত কণিকার ঝিল্লিতে A অ্যান্টিজেন আছে) এবং তোমার বন্ধুর রক্তের গ্রুপ যদি B হয় (অর্থাৎ রক্তরসে a অ্যান্টিবডি আছে) তাহলে তুমি তোমার বন্ধুকে রক্ত দিতে পারবে না। যদি দাও তাহলে তোমার A অ্যান্টিজেন তোমার বন্ধুর a অ্যান্টিবডির সাথে বিক্রিয়া করে বন্ধুকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিতে পারে।


তাই দাতার রক্তে যে অ্যান্টিজেন থাকে তার সাথে মিলিয়ে এমনভাবে গ্রহীতা নির্বাচন করতে হয় যেন তার রক্তে দাতার অ্যান্টিজেনের সাথে সম্পর্কিত অ্যান্টিবডিটি না থাকে। এই মূলনীতির উপর ভিত্তি করে কোন গ্রুপ কাকে রক্ত দিতে পারবে বা পারবে না, তার একটা ছক বানানো যায়।




সারণি: ABO পদ্ধতিতে মানুষের রক্তের গ্রুপ অনুযায়ী দাতা ও গ্রহীতার তালিকা


রক্তের গ্রুপ

যে গ্রপুকে রক্ত দান করতে পারে

যে গ্রপু থেকে রক্ত গ্রহণ করতে পারে

A

A,AB

A,O

B

B,AB

B,O

AB

AB

A,B,AB,O

O

A,B,AB,O

O



উপরের সারণিটি লক্ষ করলে দেখতে পারবে এ গ্রুপের রক্তবিশিষ্ট ব্যক্তি সব গ্রুপের রক্তের ব্যক্তিকে রক্ত দিতে পারে। এদের বলা হয় সর্বজনীন রক্তদাতা (universal donor)। AB রক্তধারী ব্যক্তি যেকোনাে ব্যক্তির রক্ত গ্রহণ করতে পারে। তাই তাকে সর্বজনীন রক্তগ্রহীতা (universal recipient) বলা হয়।


আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে সর্বজনীন রক্তদাতা কিংবা সর্বজনীন রক্তগ্রহীতার ধারণা খুব একটা প্রযােজ্য নয়। কেননা, রক্তকে অ্যান্টিজেনের ভিত্তিতে শ্রেণিকরণ করার ক্ষেত্রে ABO পদ্ধতি সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ হলেও রক্তে আরও অসংখ্য অ্যান্টিজেন থাকে, যেগুলাে ক্ষেত্রবিশেষে অসুবিধার কারণ হতে পারে।


যেমন: রেসাস (Rh) ফ্যাক্টর, যা এক ধরনের অ্যান্টিজেন। কারাে রক্তে এই ফ্যাক্টর উপস্থিত থাকলে তাকে বলে পজিটিভ আর না থাকলে বলে নেগেটিভ। এটি যদি না মেলে তাহলেও গ্রহীতা বা রােগী আরও অসুস্থ হয়ে পড়তে পারেন। তাই ABO গ্রুপের পাশাপাশি রেসাস ফ্যাক্টরও পরীক্ষা করে মিলিয়ে দেখা চাই।


র্থাৎ রেসাস ফ্যাক্টরকে বিবেচনায় নেওয়া হলে রক্তের গ্রুপগুলাে হবে A+, A-, B+ B, AB+, AB-, O+ এবং ০-। নিগেটিভ গ্রুপের রক্তে যেহেতু রেসাস ফ্যাক্টর অ্যান্টিজেন নেই, তাই এটি পজিটিভ গ্রুপকে দেওয়া যাবে কিন্তু পজিটিভ গ্রুপের রক্ত নেগেটিভ গ্রুপকে দেয়া যাবে না।



রক্তদান ও সামাজিক দায়বদ্ধতা


আঘাত, দুর্ঘটনা, শল্যচিকিৎসা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা অন্য কোনাে কারণে অত্যধিক রক্তক্ষরণ হলে দেহে রক্তের পরিমাণ আশঙ্কাজনকভাবে কমে যায়। রক্তশূন্যতা দূর করার জন্য ঐ ব্যক্তির দেহে রক্ত পরিসঞ্চালনের প্রয়ােজন হয়। জরুরি ভিত্তিতে এই রক্তশূন্যতা দূর করার জন্য রােগীর দেহে অন্য মানুষের রক্ত দিতে হয়।


অন্যকে রক্তদান করা বর্তমানে একটি সাধারণ ঘটনা। জরুরি অবস্থায় অন্য ব্যক্তির রক্ত সরাসরি বা ব্লাড ব্যাংকের মাধ্যমে সংগ্রহ করা রক্ত রােগীর দেহে প্রবেশ করানাে হয়। কোনাে ব্যক্তির শিরার মধ্য দিয়ে বাইরে থেকে অন্যের রক্ত প্রবেশ করানাের প্রক্রিয়াকে রক্ত সঞ্চালন (Blood transfusion) বলে।


এটি একটি চমৎকার ফলপ্রদ ব্যবস্থা, যার ফলে রােগীর প্রাণ রক্ষা হয়। তবে কোনাে অবস্থাতেই রােগীর রক্তের গ্রুপ ও প্রকৃতি পরীক্ষা না করে এক রােগীর দেহে অন্য কোনাে ব্যক্তির বা ব্লাড ব্যাংকে রক্ষিত রক্ত প্রবেশ করানাে উচিত নয়। ব্যতিক্রম হলে নানা জটিলতা সৃষ্টি হয়ে রােগীর জীবন বিপন্ন হওয়ার আশঙ্কা অনেকাংশে বেড়ে যায়।


যেমন: রক্তকণিকাগুলাের জমাট বাঁধা, বিশ্লিষ্ট হওয়া, জন্ডিসের প্রাদুর্ভাব এবং প্রস্রাবের সাথে হিমােগ্লোবিন নির্গত হওয়া ইত্যাদি।


আকস্মিক কোনাে দুর্ঘটনায় আহতদের জন্য জরুরি ভিত্তিতে রক্তের প্রয়ােজন হয়। মনে রাখতে হবে, এটি আমাদের সবার জন্য একটি সামাজিক দায়বদ্ধতা। যেহেতু রক্তের কোনাে বিকল্প নেই, তাই এরূপ অবস্থায় অনেক সময় প্রচুর রক্তের প্রয়ােজন হয় এবং অন্যের কাছ থেকে রক্ত সংগ্রহ করে ঐ জরুরি অবস্থা মােকাবেলা করতে হয়। এরূপ জরুরি পরিস্থিতিতে জনগণের সহযােগিতা প্রয়ােজন হয়।


অন্যকে রক্তদান করা একটি মহৎ কাজ। এতে রক্তদাতার নিজের কোনাে ক্ষতি হয় না। একজন সুস্থ মানুষের দেহ থেকে 450 মিলি রক্ত বের করে দিলে তেমন কোনাে অসুবিধা হয় না। তার দেহ প্রতি সেকেন্ডে প্রায় 20 লক্ষ লােহিত রক্তকণিকা সৃষ্টি করতে পারে। দেখা গেছে, কোনাে সুস্থ ব্যক্তি চার মাস পর পর রক্তদান করলে দাতার দেহে সামান্যতম কোনাে অসুবিধা হয় না।


বর্তমানে রক্তদানে উদ্বুদ্ধকরণে নানা রকম কর্মসূচি নেওয়া হচ্ছে। যেমন: কোনাে বিশেষ দিবসে বা বিশেষ কোনাে অনুষ্ঠানে রক্তদান কর্মসূচির আয়ােজন। এতে জনসাধারণের মাঝে রক্তদান সম্পর্কে ভ্রান্ত ধারণা ও ভীতি অনেকাংশে হ্রাস পাচ্ছে। অতীতের তুলনায় মানুষ এখন রক্তদান এবং গ্রহণ সম্পর্কে অধিক আগ্রহী ও সচেতন।


Related Posts

নবীনতর পূর্বতন

যোগাযোগ ফর্ম